মাহাবুব আলম (অষ্টগ্রাম) কিশোরগঞ্জ।
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল দীর্ঘ ২৩টি বছর, কিন্তু আজও মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ে মিশে থাকা সেই বিষাদময় স্মৃতি মুছে যায়নি। ২০০৩ সালের ২১ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনহারাদের গগনবিদারী আর্তনাদে। মেঘনা নদীর বুকে ‘এমভি মজলিশপুর’ লঞ্চডুবিতে বরসহ ৫২ জন যাত্রীর সলিল সমাধি হয়েছিল। অষ্টগ্রামের ইতিহাসে এত বড় শোকাবহ ও মর্মান্তিক ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই প্রতিবছর ২১ এপ্রিল এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক বিভীষিকাময় ‘কালো দিবস’ হিসেবে পরিচিত।
২০০৩ সালের ২১ এপ্রিল (৯ বৈশাখ)। অষ্টগ্রামের বিশিষ্ট কাপড় ব্যবসায়ী রামকৃষ্ণ দেবনাথের ছোট ভাই কাজল দেবনাথ (৩১)এর বিয়ে উপলক্ষে ৭০ জন বরযাত্রী নিয়ে ‘এমভি মজলিশপুর’ লঞ্চটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে লঞ্চটি মেঘনা নদীর পানিশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ মাত্র ২ মিনিটের এক প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দযাত্রার সমাপ্তি ঘটে এবং ৭০ জন যাত্রী নিয়ে অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় লঞ্চটি।
সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা ১৮ জনের একজন বাগেরহাটি ভূইয়া বাড়ীর দীপু ভূঁইয়া (৬১)। আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে শিউরে ওঠেন তিনি। সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল সারা দুনিয়া বুঝি এক নিমেষে পানিতে ডুবে গেছে। আমরা কীভাবে তীরে পৌঁছালাম, কিছুই বুঝতে পারিনি। দুর্ঘটনার পর টানা ৫ দিন নৌবাহিনী ও নারায়ণগঞ্জের ডুবুরি দল যৌথ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে একে একে ৫২টি নিথর মরদেহ উদ্ধার করেছিল।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তৎকালীন মেধাবী ছাত্র এইচএসসি পরীক্ষার্থী সৈয়দ নিয়াজ হাসান সোহাগ। তার বড় ভাই ততকালীন নবনির্বাচিত সদর ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু টানা ৫ দিন পানিশ্বরে আবস্থান করে নিথর মরদেহ একে একে অষ্টগ্রাম পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন। তিনি সেই দিনটির ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, অষ্টগ্রামের ইতিহাসে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটনা আর ঘটেনি। এটি আমাদের পুরো অঞ্চলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি এবং গভীর শোকের দিন। ২৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের স্মৃতিতে আজও অম্লান সেই প্রিয় মুখগুলো। আমাদের হৃদয়ের সেই ক্ষত আজও শুকায়নি।
সেদিন দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস সাত্তার, মুফতি ফজলুল হক আমিনি এমপি এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় উপনেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ-সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
স্বজনহারাদের দাবি, এমন ট্রাজেডি যেন আর কারো জীবনে না আসে এবং নৌ-পথ যেন সবার জন্য নিরাপদ হয় এবং প্রতি বছর ২১ এপ্রিল স্থানীয় প্রশাসন স্বরন সভার ব্যাবস্থা গ্রহন করেন।
মন্তব্য করুন